(CLICK ON CAPTION/LINK/POSTING BELOW TO ENLARGE & READ)

Sunday, February 17, 2013

নষ্ট শ্রমদিবসের ৯৯.৬ শতাংশই লক-আউটে এরপরও ধর্মঘটকে কাঠগড়ায় তোলা হবে?


নষ্ট শ্রমদিবসের ৯৯.৬ শতাংশই লক-আউটে এরপরও ধর্মঘটকে কাঠগড়ায় তোলা হবে?

রাহুল মজুমদার

বন্ধ হয়েছে একের পর এক কারখানা। শুনশান হয়েছে উৎপাদনের বিস্তৃত জমি। কমেছে শ্রমিক সংখ্যাও। কর্মজীবী মানুষ হয়েছেন রুজি-হারা। তবু তারমধ্যেই ধর্মঘটের চড়া বিরোধিতায় সংবাদমাধ্যমের ওকালতিতে নিউজপ্রিন্টে, স্লটে চলছে রাজ্যে শ্রমদিবস নষ্টের ওজরে কুম্ভীরাশ্রুর অকাল বর্ষণ। কিন্তু প্রশ্ন একটাই। শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে যতটা ভারী হয়ে ঝরে পড়ে সংবাদমাধ্যমের চোখের জল, রাজ্যে মালিকপক্ষের তৈরি করা লক-আউটের কারণে কি ঠিক ততটাই চোখের জল ঝরে? বোধ হয় না। সম্প্রতি বাংলাকে দিশা দেখানোর যে হট্টমেলা অনুষ্ঠিত হলো হলদিয়ার বুকে, সেই ‘বেঙ্গল লিডস’-এর মঞ্চ থেকেও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর অনেক সদর্প ঘোষণার আড়ালে ছিল না আজকের রাজ্যের করুণ পরিস্থিতি। ছিল না গত একবছরে রাজ্যের লক-আউট চিত্র।

মুখ্যমন্ত্রীর হাতে থাকা সেই শিল্প সংক্রান্ত রিপোর্টই বলে দিচ্ছে গতবছর রাজ্যে হিমাঙ্কে নেমে এসেছে শ্রমিক-কর্মচারীদের ধর্মঘটের ওজরে শ্রমদিবস নষ্টের পরিসংখ্যান, হার। প্রশ্ন হলো তবু শ্রমদিবস নষ্টের মিলিওনিয়ারব্যাপী সংখ্যা কি কমেছে? সরকারী তথ্যেই ধরা পড়ছে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলে শ্রমিক আন্দোলন ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে। বেড়েছে শ্রমিকশ্রেণীর ওপর আক্রমণের তীব্রতা। রাজ্যে একের পর এক শিল্প পাততাড়ি গুটোনোর সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক চিত্রেই ধরা পড়েছে কমেছে ধর্মঘট আন্দোলন। বেড়েছে লক আউটের সংখ্যা ও মাত্রা। ধর্মঘট আর লক-আউটের এই নামা-ওঠার মধ্যেই কর্মক্ষেত্রে অস্থিরতাও যে বেড়েছে সেই প্রমাণও মেলে বেঙ্গল লিডস্‌-এর মঞ্চে দাঁড়ানো মুখ্যমন্ত্রীর হাতে রাখা সরকারী নথিতেই।

পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে রাজ্যে শতকরা ৯৯.৬০ শতাংশ শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছে যে লক-আউটের কারণে সেই লক-আউটের সিংহভাগ কারণ শিল্পাঙ্গনে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা এবং নৈরাজ্য। লক-আউটের পেছনে থাকা কারণগুলির মধ্যে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন, ভাতার হার যেখানে শতকরা ৫.৯৯ শতাংশ, সেখানে শিল্পক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতা ‍ও নৈরাজ্যের অভিযোগ লক-আউটের পরিসংখ্যান পৌঁছেছে ৫৩.৮৯ শতাংশে।

সম্প্রতি রাজ্য সরকারের ঢাকঢোল পেটানো শিল্পযজ্ঞে (বেঙ্গল লিডস্‌) রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরই সদর্প ঘোষণা, রাজ্যে নাকি শ্রমিক আন্দোলন কমেছে ব্যপক মাত্রায়। কেননা সরকারী তথ্যেই প্রকাশ বাড়াবাড়ি রকমের রাজ্যে ধর্মঘটের নজির ছাঁটাই হয়েছে এই সময়ে। প্রশ্ন হলো ধর্মঘটের নজির নয় ছাঁটাই হয়েছে, কিন্তু তাতে কি শ্রমদিবস নষ্টের পরিমাণ কমেছে বিশাল কিছু? না, তা নয়। মা মাটি মানুষের সরকারের পরিসংখ্যান (গ্রাফিক্স চিত্রসহ) বলছে রাজ্যে বিস্তর কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেলেও, যে’কটা চালু কারখানা রয়েছে তার মধ্যেই যা লক-আউট হয়েছে তার সংখ্যা বা হার এর আগে ২০০৮ সালের চিত্রকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। অর্থাৎ ২০০৮ সালের তুলনায় লক-আউটের সংখ্যা বেশিই রয়েছে ২০১১ সালের হিসেবে। আর ধর্মঘট? সরকারের পরিসংখ্যান বলছে ধর্মঘটের সংখ্যা প্রায় শূণ্যতে নেমে এসেছে গতবছরে।

অর্থাৎ সোজা কথা, রাজ্যে নতুন সরকারের মেয়াদকালে শ্রমিক আন্দোলনের ওপর নেমে এসেছে বেনজির আক্রমণ। আর তার জেরেই কমেছে ব্যাপক মাত্রায় ধর্মঘট এবং একইসঙ্গে সমানতালে বেড়েছে লক-আউটের নজির। কারণে অকারণে কারখানার অভ্যন্তরে চলেছে শ্রমিক ছাঁটাই। তার ফলে শ্রমদিবস নষ্টের নজির কমেনি বিন্দুমাত্র। রাজ্য সরকার ঐ তথ্য পরিসংখ্যানের রি‍পোর্টেই জানাচ্ছে এই তথ্যের বাইরেও অনেক লক-আউটের ঘটনা রয়েছে, যেগুলো রাজ্য সরকারের কাছে খবর এসে পৌঁছয়নি। জানা গেছে ২০১১ সালের একটিমাত্র লক-আউটের ঘটনাতেই ৯০০ শ্রমিক-কর্মচারীকে লে-অফ করা হয়েছে। দুটি ঘটনায় ৫ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারীদের ওপর আক্রমণের আর কোন নজির বাকি রয়েছে?

এই সময়ের মধ্যে রাজ্য সরকারের ভূমিকাও ধরা পড়েছে আজকের সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যানে। কী তথ্য রয়েছে সেখানে। দেখা যাচ্ছে ২০০৭ সালে যেখানে রাজ্য সরকার শিল্প সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিল, সেখানে গতবছর অর্থাৎ ২০১১ সালে সাকুল্যে ২৭৪৩টি শিল্প সংক্রান্ত সমস্যায় হস্তক্ষেপ করেছে রাজ্য সরকার। তাও এই নজিরগুলোর বেশিরভাগই ২০১১ সালের প্রথমার্ধের মেয়াদে। যেখানে পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার উদ্যোগী ভূমিকা নেয়। বাম আমলের প্রথমার্ধেই আশির দশকে শ্রমিক স্বার্থ নিয়েই ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্টের একটি সংশোধনী আনে রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকার। সেই সং‍‌শোধনীতেই স্পষ্ট বলে দেওয়া হয় যে কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের পুরোদস্তুর বন্দোবস্ত ছাড়া মালিকপক্ষ বা কর্তৃপক্ষ কারখানায় ক্লোজার করতে পারবে না। এর ফলে শ্রমিকদের ওপর আক্রমণের মাত্রা কমেছিল অনেকটাই। পরবর্তী সময়েও বরাবরই রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকার যে শ্রমিক স্বার্থ নিয়েই চলতো তারও কিছু স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে রাজ্যে শিল্প সংক্রান্ত সমস্যার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পরিসংখ্যানে। অতীতে তো বটেই এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের মেয়াদের শেষপর্বে দেখা যাচ্ছে ২০০৭ সালে শিল্প সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে শ্রমিক মালিক আলোচনার মাধ্যমে ১২৯টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিসম্পন্ন হয়েছিল। আর ২০১১ সালে? সাকুল্যে ৪৬টা দ্বিপাক্ষিক চুক্তিসম্পন্ন হয়েছে শ্রমিক মালিক বিরোধিতার অবসানে। এখানেই স্পষ্ট বোঝা যায় কেন রাজ্যে শিল্পক্ষেত্রে কারণে অকারণে মালিকপক্ষের নামিয়ে আনা লক-আউটের মাত্রা এমন তীব্র জায়গায় পৌঁছচ্ছে। কেন আক্রান্ত হচ্ছেন কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা।

তবে শ্রমিকশ্রেণীর ধর্মঘট আন্দোলন সংক্রান্ত প্রশ্নে সংবাদমাধ্যমের খাড়া করা ওজর যে সর্বৈব মিথ্যা তার প্রমাণও মেলে এই সরকারী নথিতেই। রাজ্যে শ্রম, শিল্প সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় নিয়ে মা মাটি মানুষের সরকারের তৈরি করা এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে রাজ্যে শ্রমদিবস নষ্টের মূল কারিগর শ্রমিকের ধর্মঘট নয়, মালিকের তরফে কারখানার বুকে নামিয়ে আনা লক-আউট। এই চিত্র আজকের নতুন নয়, ২০০৭ সালেও মিলবে একই প্রবণতা। যেখানে সরকারী তথ্যেই ফুটে উঠেছে ২০০৭ সালে কারখানায় লক-আউটের নজির ২৭৬টা আর ঐ একই বছরে গোটা রাজ্যে ধর্মঘটের নজির সাকুল্যে ১১টি। শুধু ২০০৭ কেন? তারপরের বছরটায় ২০০৮ সালে পরিসংখ্যান বলছে রাজ্যে লক-আউটের নজির ২৭২টি, আর শ্রমিকদের ধর্মঘটের নজির সাকুল্যে ১২টি। ’০৮ সালে রাজ্যে লক-আউটের কারণে ১কোটি ৫৭লক্ষ শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছে। আর ঐ বছরেই রাজ্যে ধর্মঘটের কারণে ৩৮লক্ষ শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছে। এরপরের বছরেও ২০০৯ সালে মালিকপক্ষের তৈরি করা লক-আউটের জেরে রাজ্যে ১কোটি ৪৩লক্ষ শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছে, যা গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে সবচাইতে কম।

এমনকি সম্প্রতি হলদিয়ার বুকে শিল্প সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী যে পরিসংখ্যান হাতে নিয়ে সাফল্য বলে দাবি করে গেছেন, সেই পরিসংখ্যানেই বলছে গত বছরেও মালিকপক্ষের লক-আউটের নজির কমাতে পারেনি রাজ্যের সরকার। সেই ২০০৯ সালের পরিসংখ্যানে থেকেও তা বেশি। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর প্রশাসনের সাফল্য বলে দাবি করলেও গত বছরের শ্রমদিবস নষ্টের পরিসংখ্যান এক লজ্জাকর চিত্র তুলে ধরেছে রাজ্য সরকারের শ্রম দপ্তরের কাছেই। কী বলছে সেই পরিসংখ্যানে? দেখা যাচ্ছে ২০১১ সালে রাজ্যে সর্বমোট শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছে ১কোটি ৪৯লক্ষ ৩০হাজার। আর এই সংখ্যার মধ্যেই মালিকপক্ষের লক-আউটের কারণে শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছে ১কোটি ৪৮লক্ষ ৭০হাজার। অর্থাৎ সাকুল্যে ৬০হাজার শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছে গতবছর শুধুমাত্র শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে। এরপরও কি স্পষ্ট ধরা পড়ে না বর্তমান রাজ্য সরকার কোন্‌ স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে?

পরিসংখ্যান আরও অনেক কিছু বলে দিচ্ছে। যেমন লক-আউট ধর্মঘটের জেরে শ্রমদিবস অপচয়ের চিত্রের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায় রাজ্যের শাসকদলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। যদিও এই সময়ের মধ্যে রাজ্যে ঢের বেশি শিল্প পাততাড়ি গুটিয়েছে। একরের পর একর শেডের তলায় উৎপাদনের জমি হয়েছে শুনশান। তালাবন্ধ চেহারা নিয়েছে চালু কারখানা। তবু তার মধ্যেই ২০১১ সালে ১কোটি ৪৯লক্ষ ৩০হাজার শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছে ২৮১টি কর্মক্ষেত্রে। যদিও এর ঠিক দু’বছর আগের পরিসংখ্যান বলছে (এটাও আজকের পেশ করা সরকারী চিত্রই) ২০০৯ সালে ১কোটি ৮৩লক্ষ শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছিল। যদিও সেক্ষেত্রে ২৭৯টি কর্মক্ষেত্রের ঘটনা। কিন্তু তফাৎ একটাই। ২০০৯ সালে এই শ্রমদিবস নষ্ট হওয়ার ঘটনায় জড়িয়ে ছিলেন প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী। আর আজ ২০১১ সালে প্রায় দেড়কোটি শ্রমদিবস নষ্ট হওয়ার নজিরে জড়িয়ে রয়েছেন মাত্র ৯১ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। প্রশ্ন উঠছে তাহলে কি এই সময়কালে লক-আউটের মেয়াদকাল ক্রমান্বয়ে দীর্ঘতর হলো? শ্রমিকদের ওপর নেমে আসা আক্রমণের মাত্রা আরও তীব্র হল? নইলে অল্প সংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নজিরে কেন এত বিশাল সংখ্যক শ্রমদিবস নষ্ট হবে? রাজ্যের শাসকদলের সর্বোময় নেত্রী কী বলেন? কী-ই বা বলেন বুর্জোয়া সংবাদমাধ্যমের শ্রমিকদরদী গণিতজ্ঞেরা?

No comments:

Post a Comment