(CLICK ON CAPTION/LINK/POSTING BELOW TO ENLARGE & READ)

Tuesday, February 19, 2013

ধর্মঘট ভাঙার মরিয়া চেষ্টায় পুলিসও নামালেন মমতা



ধর্মঘট ভাঙার মরিয়া চেষ্টায় পুলিসও নামালেন মমতা

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১৯শে ফেব্রুয়ারি— সাধারণ ধর্মঘটের বিরোধিতায় নেমে এবার মাত্রাজ্ঞান হারিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার! ধর্মঘট ভাঙতে সর্বশক্তি দিয়ে রাজ্য প্রশাসনকে ব্যবহারের নজির গড়লো রাজ্য সরকার। 

দিন কয়েক ধরেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি থেকে শুরু করে রাজ্যের মন্ত্রীরা সাধারণ ধর্মঘট ভাঙতে সক্রিয় বিরোধিতা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার ধর্মঘটকে ঠেকাতে মাত্রা ছাড়িয়েছে রাজ্য সরকার। এদিনও মহাকরণে সরকারের মন্ত্রীরা সক্রিয় ছিলেন ধর্মঘটের বিরোধিতা নিয়েই। এদিন সরকারের মন্ত্রীরা তাদের প্রতিটি বৈঠক থেকে সাংবাদিক সম্মেলন করে আগাগোড়া বিরোধিতা করে গেছেন ধর্মঘটের। যে মন্ত্রী বৈঠক করেননি তিনি সাংবাদিক ডেকে ধর্মঘট ভাঙতে সরকারের পদক্ষেপ শুনিয়েছেন। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে গেছে এদিন সন্ধ্যায় রাজ্যের প্রশাসনিক ও কর্মীবর্গ দপ্তরের জারি করা এক সার্কুলার। যে দপ্তর মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির অধীনে।

এদিন রাজ্যের প্রশাসনিক ও কর্মীবর্গ দপ্তর থেকে জারি করা এক সার্কুলারে(নং-179-PAR(A.R)/0/3M-5/2013) উল্লেখ করা হয়েছে, “বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নের ডাকা ২০শে ও ২১শে ফেব্রুয়ারির ধর্মঘটে সরকারী দপ্তরে কাজকর্ম স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ 

গোটা দেশ জানে ১১টি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন ২০শে ও ২১শে ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। যে ধর্মঘটের আয়োজকদের মধ্যে আছে কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠন আই এন টি ইউ সি, বি জে পি-র শ্রমিক সংগঠন বি এম এস সহ বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন। গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর দিল্লির তালকোটরা স্টেডিয়ামে দেশের সমস্ত কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন একযোগে টানা ৪৮ঘন্টা দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়। মূল্যবৃদ্ধি, ঠিকা শ্রমিকদের ন্যূনতম ১০হাজার টাকা বেতন সহ ১০দফা দাবিতে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরুদ্ধেই দেশজুড়ে ধর্মঘটের পথে যেতে বাধ্য হন কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠনগুলি।

এই তথ্য রাজ্য সরকারের কাছে নেই এমন ভাবলে ভুল হবে। আসলে সচেতনভাবেই কেবলমাত্র বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনকে ধর্মঘটের আয়োজক হিসাবে উল্লেখ করে নজিরবিহীনভাবে মহাকরণ, খাদ্য দপ্তর সহ রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ দপ্তরগুলিতে কর্মীদের রেখে দেওয়ার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে সরকারী সার্কুলারে। ধর্মঘট বিরোধিতায় এতটাই উদ্যমী তৃণমূল সরকার। 

ধর্মঘটীদের কাছে ধর্মঘট প্রত্যাহার করার স্বাভাবিক অনুরোধ করে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। সেই অনুরোধ প্রত্যাখান করেন শ্রমিক সংগঠনগুলি। সোমবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার চার সদস্যের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে ধর্মঘটের সিদ্ধান্তে আরও একবার অনড় থাকার কথা গতকালই ঘোষণা করে দেয় ধর্মঘটীরা। 

কিন্তু কোনো আলোচনা নয়। প্রথম থেকে এরাজ্যে ধর্মঘট ভাঙতে মরিয়া হয়ে পথে নামে রাজ্য সরকার। এখনও দেশের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জি সাধারণ ধর্মঘটের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেন। গত ২রা ফেব্রুয়ারি হুগলীর পোলবায় রাজ্য সরকারের এক কর্মসূচীতে যোগ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ২০শে ও ২১শে ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘট নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেন। তারপর থেকে গোটা রাজ্যজুড়ে সরকারী উদ্যোগে শুরু হয়ে যায় ধর্মঘট ভাঙার উদ্যম।

গত ৩৪বছরে সরকারী উদ্যোগে ধর্মঘট ভাঙার এমন উদ্যম কখনও দেখা যায়নি। গত ২০১২সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি এইরকমই এক দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটকে ঘিরে রাজ্যের তৃণমূল সরকারের জারি করা সার্কুলারে প্রথমবার সরকারের মুখোশ খসে যায়। সে দফায় রাজ্যের মুখ্যসচিব সার্কুলার দিয়ে সরকারী কর্মীদের ধর্মঘটের দিন (২৮শে ফেব্রুয়ারি,২০১২)ছুটি বাতিলের নোটিস জারি করেছিলেন।

কিন্তু এবার রাজ্য সরকার আরও বেপরোয়া। এবার ধর্মঘট ভাঙতে সরাসরি পথে নামানো হয়েছে পুলিসকে। কলকাতা ও রাজ্য পুলিসের প্রতিটি থানায় পুলিস জিপে চড়ে মাইক প্রচার শুরু করেছে। কী বলা হচ্ছে সেই মাইক প্রচারে?

এদিনই বেহালা চৌরাস্তা দিয়ে কলকাতা পুলিসের একটি জিপে চড়ে জনা কয়েক পুলিস কর্মী জনতার উদ্দেশে বলছিলেন, ‘‘আগামীকাল দোকানপাট খোলা থাকবে। স্কুল কলেজ স্বাভাবিক থাকবে। আপনারা কাজে বের হন। আপনাদের নিরাপত্তায় পুলিস পাশে থাকবে।’’ শেষ বাক্যটি বলার সময় পুলিসকর্মীটির গলা কেঁপে গেল কিনা বোঝা যায়নি। তবে পথচলতি মানুষের টিপ্পনী ছিলো, ‘‘নিজেদের নিরাপত্তা রাখতে পারছে না। মানুষের রাখবে বলছে?’’ কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে রাজ্য সরকারের ধর্মঘট ভাঙতে এমন উদ্যমী মনোভাব এর আগে দেখা যায়নি। কলকাতার পাশাপাশি প্রতিটি জেলার থানা এলাকাতেও পুলিসকে জিপ নিয়ে ধর্মঘটের বিরোধিতায় পথে নেমে প্রচার করতে দেখা গেছে।

এদিনও যেমন মহাকরণে জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজ্য সরকারের গড়া টাস্ক ফোর্সের নির্ধারিত বৈঠক ছিল। এই বৈঠকেও মুখ্যমন্ত্রী টাস্ক ফোর্সের সদস্যদের নির্দেশ দেন, আগামীকাল দোকানপাট খোলা রাখতে হবে। জিনিসপত্রের দাম নিয়ে উদ্বেগের থেকে ‘বামপন্থীদের’ ধর্মঘট ভাঙার কৌশল নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলেন খোদ মমতা ব্যানার্জি। একই ভূমিকায় ছিলেন রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী মদন মিত্র। এদিনই তিনি বেসরকারী বাস, মিনিবাস, ট্যাক্সির মালিক সংগঠনগুলির সঙ্গে বৈঠক শেষে মহাকরণে জানান, ‘‘বাস মালিকরা বলেছে, আমরা বাস চালাতে চাই। ধর্মঘটে গাড়ি ভাঙচুর হলে আমরা ইনসিওরেন্স কোম্পানির সঙ্গে ক্ষতিপূরণ নিয়ে কথা বলছি।’’ যদিও বাস মালিক সংগঠনের দাবি, আমরা মন্ত্রীকে বলেছি, বাস চালায় চালক ও কন্ডাকটাররা। সুতরাং তারা চাইলে বাস পথে নামবে। কিন্তু বাস ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ নিয়ে এদিন মহাকরণে মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন রাষ্টায়ত্ত বীমা কোম্পানি ন্যাশনাল ইনসিওরেন্স। তাঁদের তরফে অন্যতম ডিরেক্টর কুলদীপ সিং স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দেন, ধর্মঘটের দিন গাড়ি ভাঙচুর হলে একমাত্র যাঁদের কম্প্রিহেনসিভ পলিসি আছে তারাই ক্ষতিপূরণ পেতে পারে। এই ‘কম্প্রিহেনসিভ পলিসি’ গ্রাহকদের সংখ্যার কোনো হিসাব বীমা কোম্পানির কাছে নেই। এবং সংখ্যাটা যে নেহাতই নগণ্য তা স্বীকারও করে নেন বীমা কোম্পানির কর্তারা। এসবে মাথা ঘামানোর মত সময় নেই রাজ্যের মন্ত্রীদের। তাদের আসল উদ্দেশ্যে প্রশাসনকে সর্বশক্তি দিয়ে ব্যবহার করে ধর্মঘট বিরোধিতায় নামাতে হবে।

এবারও রাজ্য সরকারী কর্মীদের গতবারের মতো ২০শে ও ২১শে ফেব্রুয়ারি ছুটি বাতিলের নির্দেশ জারি করা হয়েছে। গতকালই এই সার্কুলার জারি করেছিলো রাজ্য সরকার। এদিনও রাজ্যের অর্থ দপ্তরের প্রধান সচিব এইচ কে দ্বিবেদী ফের জারি করেন আরও একটি সার্কুলার। এই সার্কুলারে রাজ্য সরকার অধিগৃহীত সংস্থা, নিগম, বোর্ড, স্বশাসিত সংস্থা, পঞ্চায়েত ও পৌরসভার কর্মীদেরও ছুটি বাতিল করা হচ্ছে। আসলে ধর্মঘট ভাঙতে মরিয়া সরকার সরকারী বেতনভুক কর্মীদের কাজে যোগদান নিশ্চিত করতে কোনো ফাঁক রাখতে চায়নি। 

রাজ্যের শিল্পাঞ্চলে, কারখানা গেটে শ্রমিক মহল্লায় সরকারী মদতে ধর্মঘট ভাঙতে এদিন কোনো খামতি ছিলো না।

No comments:

Post a Comment