(CLICK ON CAPTION/LINK/POSTING BELOW TO ENLARGE & READ)

Sunday, February 17, 2013

পাহাড়, জঙ্গলমহল নয়, মানুষ হাসছেন সরকারের কাণ্ডকারখানা দেখে: বিমান বসু


দীপঙ্কর দাস

মালদহ, ১৭ই ফেব্রুয়ারি — মুখ্যমন্ত্রীর দাবি পাহাড় হাসছে। জঙ্গলমহল হাসছে। সেখানের মানুষের মুখে হাসি নেই। আসলে রাজ্যের মানুষ হাসছেন সরকারের কাণ্ডকারখানা দেখে। নৈরাজ্যের রাজত্বে উন্নয়ন হয় না। শান্তির পরিবেশ, শৃঙ্খলাবদ্ধ দল প্রশাসন থাকলে তবেই উন্নয়ন সম্ভব। যে কোনো রাজ্য, যে কোনো দেশের ক্ষেত্রেই একথা সত্য। রবিবার মালদহ শহরে এক সভায় রাজ্যে তৃণমূল সরকার এবং কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউ পি এ সরকারের তীব্র সমালোচনা করে একথা বলেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু।

তিনি বলেন, কোন্‌ দিকে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ? সরকার যে দিকে নিয়ে যেতে চাইছে রাজ্যকে তা ভয়ঙ্কর দিক। এর নেতিবাচক প্রভাব মানুষের উপর পড়ছে। স্কুল-কলেজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। দিকে দিকে নারীদের সম্ভ্রম আক্রান্ত হচ্ছে, চুরি, ডাকাতি বাড়ছে। সর্বত্র দুষ্কৃতীরা উৎসাহিত। প্রশাসনের এসব শক্ত হাতে মোকাবিলা করা উচিত। বি‍‌শেষ করে পুলিসকে। কিন্তু কী করবে পুলিস? পার্ক স্ট্রিটের ঘটনা ‘ক্লোজ’ করে দেওয়া হয়েছিল। সি সি টি ভি-র ফুটেজ দেখে দময়ন্তী সেন যখন সূত্র বের করলেন, বললেন আরো ৩জনকে ধরতে হবে, তাঁকে সরিয়ে বারাকপুরে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। এসব হচ্ছে সঙ্কেত। যদি বেশি সক্রিয় হও, যদি তদন্তের ব্যবস্থা করো তাহলে তোমার হাল খুব খারাপ হবে! রাজ্যের গোটা পুলিসবাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করতে এই পথ নিয়েছে তৃণমূল সরকার। এর ফলে পরিস্থিতি ক্রমশ আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। আরো যাবে, এখন এমন অবস্থা এই রাজ্য ছাড়তে চাইছেন আই এ এস, আই পি এস অফিসাররা। তাঁদের একটা সুবিধা আছে তাঁরা দিল্লি চলে যেতে পারেন।

ইংরেজবাজার বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বামফ্রন্ট প্রার্থী কৌশিক মিশ্রের (সাহেব) সমর্থনে মালদহ জেলা বামফ্রন্ট এদিন মালদহ কলেজ অডিটোরিয়াম হলে এই সভার আ‍‌য়োজন করে। বিমান বসু ছাড়াও ওই সভায় বক্তব্য রাখেন সি পি আই (এম) নেতা মইনুল হাসান, আর এস পি নেতা গৌতম গুপ্ত, সি পি আই-র তরুণ দাস, ফরওয়ার্ড ব্লকের জাকির হোসেন, সোস্যালিস্ট পার্টির মিলন দাস, ডি এস পি নেতা সুবোধ ভকত এবং বামফ্রন্টের প্রার্থী কৌশিক মিশ্র। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ সি পি আই (এম) নেতা শৈলেন সরকার। সভা শেষে প্রার্থী কৌশিক মিশ্রকে নিয়ে একটি বিশাল পদযাত্রা মালদহ শহরের ‍‌বিভিন্ন পথ পরিক্রমা করে। পদযাত্রার সামনের সারিতে ছিলেন বিমান বসু, পার্টিনেতা মহম্মদ সেলিম, মানব মুখার্জি, মইনুল হাসান, জেলা বামফ্রন্টের আহ্বায়ক জীবন মৈত্র, পার্টির জেলা সম্পাদক অম্বর মিত্রসহ জেলা বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ। নেতাজী মোড়ে গিয়ে মিছিলটি শেষ হয়।

সকাল থেকে সারাদিন বৃষ্টি। ঠাণ্ডার প্রকোপ সেই কারণে বেড়ে যায়। তারই মধ্যে এদিন অডিটোরিয়ামে ছিল উপচে পড়া ভিড়। সভায় বিমান বসু বলেন, ইংরেজবাজার, রেজিনগর এবং নলহাটি এই তিন কেন্দ্রের উপনির্বাচনে কে হারলো, কে জিতলো তা দিয়ে সরকারের কিছু নির্ভর করে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই নির্বাচনের কোনো প্রয়োজন ছিল কি? যিনি ইংরেজবাজারে তৃণমূলের প্রার্থী তিনি এর আগেও তৃণমূল করেছেন আবার কংগ্রেসও করেছেন। দলবদলে তিনি সিদ্ধহস্ত। কিন্তু কেন এই নির্বাচন? তার জবাব তৃণমূল এবং কংগ্রেসকে দিতে হবে। তিনি বলেন, একদিকে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার দেশের মানুষকে পথে বসাচ্ছে আর অন্যদিকে এ রাজ্যে তৃণমূল একটা নীতিহীন দল সরকার চালাচ্ছে। পেট্রোল, ডিজেলের দাম প্রায় প্রতিমাসেই বাড়িয়ে চলেছে কেন্দ্রের কংগ্রেসচালিত দ্বিতীয় ইউ পি এ সরকার। আর এর প্রভাব সমস্ত জিনিসপত্রের উপর পড়ছে। দেশের মানুষের অবস্থা কী খুব ভালো হয়ে গেছে যে পেট্রোলের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ তুলে নিল কংগ্রেস সরকার। পেট্রোল, ডিজেল, জ্বালানি তেলের সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে। জনবিরোধী নীতি নিয়ে দেশ চালাচ্ছে কংগ্রেস সরকার। বিদেশীদের কাছে ভারতের বাজার ক্রমশ তুলে দেওয়া হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ভারতে গম উৎপাদনের কী প্রয়োজন? গম আমরা পাঠাবো। তোমরা আখ চাষ করো। চিনি উৎপাদন করে পাঠাও। বিদেশীদের এই সমস্ত নীতি এখানে কার্যকর করতে গিয়ে দেশের ১১৬ কোটি মানুষের দুর্দশা বাড়ছে। ইংরেজবাজারে যে কংগ্রেস নির্বাচনে লড়াই করছে, এমন নয় যে তারা ধোয়া তুলসিপাতা আর কেন্দ্রের কংগ্রেসটা খারাপ!

বিমান বসু বলেন, এ রাজ্যে তৃণমূল বড়লোকের স্বার্থ দেখছে আর গরিব মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে চাইছে। বলছে মুসলিমদের জন্য নাকি ৯৯ শতাংশ কাজ হয়ে গেছে। এ রাজ্যে তফসিলী জাতি, উপজাতি, সংখ্যালঘু, আদিবাসী মানুষের একটা অংশ এখনো পশ্চাদপদ। বামফ্রন্ট আমলে বেশ কিছু কর্মসূচী নেওয়া হয়েছিল যার সবটা কার্যকর করা যায়নি। কিন্তু একটা কাজ তো হয়েছে, তা হলো গণতন্ত্রের বিকাশ। ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এ রাজ্যেই প্রথম চালু হয় নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে। বামফ্রন্টের সময়েই এরাজ্যে গরিব সংখ্যালঘু, আদিবাসী এবং তফসিলী মানুষ মর্যাদা পেয়েছেন। আর এখন কী দেখছি? প্রথমে ছিল কংগ্রেস-তৃণমূল আর তারপর শুধু তৃণমূল সরকার। ১ বছর ৮ মাস পূর্ণ হয়েছে। আমরা দেখলাম নির্বাচন বিধি ১১ই জানুয়ারি থেকে চালু হয়ে গেছে। ১৪ তারিখ স্বরাষ্ট্রসচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়ে দিয়েছেন এ ডি‍‌ জি (আইনশৃঙ্খলা) থেকে আই জি এবং ডি এম ও এস পি স্তর পর্যন্ত কাকে কাকে নির্বাচন চলাকালীন আর সরানো যাবে না। তাও দেখলাম এখানকার এস পি পরিবর্তন হয়ে গেল। এ ডি জি (আইনশৃঙ্খলা) বদলি হয়ে গেলেন। কমিশনের কোনো অনুমতি নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করে না এই সরকার।

বিমান বসু বলেন, গার্ডেনরিচ কাণ্ডে সব ঘটনাই আস্তে আস্তে প্রকাশ্যে আসবে। হঠাৎ দেখলাম পুলিস কমিশনারকে বদলি করে দেওয়া হলো। বিধানসভায় অধিবেশন চলাকালীন আবার অর্ডিন্যান্সও কর‍‌ছে সরকার। কোথাও কোনোদিন এসব হয় না কি? কী হচ্ছে এসব? আমরা বারবার বলছি মুখ্যমন্ত্রীকে, সর্বদলীয় বৈঠক ডাকুন। একটা সরকার চালাতে গেলে ন্যূনতম কিছু নিয়ম নীতি তো মানতে হবে। কলেজগুলিতে নির্বাচনকে ঘিরে চরম হাঙ্গামা শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, ‘ওসব ছোট ছোট ছেলেদের ব্যাপার’। বোমা বাঁধতে গিয়ে তৃণমূল কাউন্সিলরের ছেলের মৃত্যু হলো। তৃণমূলের বরো চে‌য়ারম্যানকে পুলিস খুঁজছে। রাজ্যের এক মন্ত্রীর গার্ডেনরিচের ঘটনায় স্পষ্ট মদত রয়েছে। উনি হলেন আবার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ‘মুখ’। দলীয় স্তরে তাঁর ক্ষমতা নাকি খর্ব করা হয়েছে। তাতে কী হলো? মন্ত্রী হিসাবেই তো উনি ওই কাজ করেছেন। ওনাকে তো মন্ত্রিসভা থেকেই সরানো উচিত। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, পাহাড় হাসছে, জঙ্গলমহল হাসছে। কোথায় কী? জঙ্গলমহলে ১০০টি গ্রাম পঞ্চায়েতে রেগার কোনো কাজ হচ্ছে না। আর পাহাড়ের অবস্থা তো সবাই দেখতেই পাচ্ছেন। আসলে পাহাড়, জঙ্গলমহল কেউ হাসছে না। মানুষ হাসছেন এসব কথাবার্তা, কাণ্ডকারখানা দেখে।

বিমান বসু বলেন, সরকার গঠনের পরেই আমরা বলেছিলাম গঠনমূলক কাজে আমরা সমর্থন করবো। কিন্তু ধ্বংসাত্মক কাজের সমালোচনা করবো। এ‍‌ই সরকা‍‌রের শুরু দেখেই বোঝা যাচ্ছে কী হবে! সরকার যেভাবে লম্ফঝম্ফ শুরু করলো, তাতে কিছুই আর হবে না মানুষ বুঝতে পারছেন। সরকার চালাতে গেলে গণতন্ত্রের প্রয়োজন। যা ওনার দলের মধ্যেও নেই, সরকারেও নেই।

সভায় মইনুল হাসান বলেন, তৃণমূল এবং কংগ্রেস দু’পক্ষই তাদের ভোট প্রচারের সভাগুলিতে একে অপরকে বলছেন তৃতীয় স্থানে থাকবে। তাহলে প্রথম স্থানে থাকবে কে? আসলে বামফ্রন্টের প্রার্থী কৌশিক মিশ্রের নাম প্রথমস্থানে তা দেওয়ালে লেখা হয়ে গেছে। কারণ বামফ্রন্ট ছাড়া রাজ্যে আর কো‍নো বিকল্প নেই তা ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে পারছেন।

No comments:

Post a Comment