(CLICK ON CAPTION/LINK/POSTING BELOW TO ENLARGE & READ)

Tuesday, February 19, 2013



ধর্মঘটে কাঁপবে দেশ

নিজস্ব প্রতিনিধি

নয়াদিল্লি, ১৯শে ফেব্রুয়ারি — দেশজুড়ে বুধবার-বৃহস্পতিবার সর্বাত্মক ধর্মঘটে শামিল হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণী। কেন্দ্রের সঙ্গে বৈঠক নিষ্ফলা হওয়ার পর মঙ্গলবার সমস্ত কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠনের বৈঠকে ঐক্যবদ্ধভাবেই ধর্মঘট বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে সর্বত্র। বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দাবিসনদের বিষয়ে কোন আশ্বাস দেয়নি কেন্দ্র। তাই ধর্মঘট ছাড়া আর কোন পথ নেই। জীবন-জীবিকার স্বার্থে নজিরবিহীন দু’দিনের এই ধর্মঘটের পথে যেতে বাধ্য হচ্ছেন দেশের শ্রমজীবী মানুষ।

খাদ্যপণ্যসহ সমস্ত কিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী। কোনোভাবে দাম কমানোয় উদ্যোগ নিতে রাজি নয় কেন্দ্র। উলটে পেট্রোপণ্যের বারে বারে দাম বাড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধির হার আরো চরমে পৌঁছেছে। মূল্যবৃদ্ধি চরম হারে বাড়লেও বাড়েনি মজুরি। উলটে সর্বত্র ঠিকা নিয়োগের মাধ্যমে কমানো হচ্ছে প্রকৃত মজুরি। এই অসহনীয় পরিস্থিতির অবসানে কেন্দ্রকে নির্দিষ্ট উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানায় কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠনগুলি। দু’দফায় কেন্দ্রের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলির। প্রথমে শ্রমমন্ত্রী মল্লিকার্জুন খারগের সঙ্গে বৈঠক হয়। ঐ বৈঠকে শ্রমমন্ত্রী কার্যত কোন আশ্বাস দিতে পারেননি। বারে বারে যেভাবে সংসদে অর্থমন্ত্রীরা দাম কমানোর নানা পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেন সেই একই কথা বলেছেন শ্রমমন্ত্রীও। পেট্রোপণ্যের দাম রোধ করার কোন প্রতিশ্রুতি শোনা যায়নি। মজুরি নিয়ে একটি মামুলি সংশোধনীর কথা বললেও ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা মজুরির প্রতিশ্রুতি মেলেনি। ফলে বৈঠক শেষে শ্রমিক সংগঠনগুলি ধর্মঘট বহাল রাখার কথা জানিয়ে দেন। ফের চারদিন বাদে সোমবার কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী একে অ্যান্টনির নেতৃত্বে কৃষিমন্ত্রী শারদ পাওয়ার ও শ্রমমন্ত্রী খারগের উপস্থিতিতে আরেক দফা বৈঠক হয়। ঐ বৈঠকে একইভাবে দশ দফা দাবির কথা ব্যাখ্যা করেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। অন্যদিকে কেন্দ্রের তরফে বেশিরভাগ দাবি উপেক্ষা করে মজুরি এবং কর্মসংস্থান নিয়ে একটি নীতি গ্রহণ করা হবে বলে কেন্দ্রের তরফে প্রস্তাব দেওয়া হয়। নীতিতে আদতে কী বলা হবে তাও জানাতে রাজি হননি মন্ত্রীরা। ফলে কোন ইতিবাচক সাড়া এতে ছিল না বলেই মনে করেছে শ্রমিক সংগঠন।

আই এন টি ইউ সি নেতা সঞ্জীব রেড্ডি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সরকারের কাছে আমরা দাবিসনদ পেশ করে এনিয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আরজি জানিয়েছিলাম। কিন্তু আলোচনায় একটাও ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা কেন্দ্র ঘোষণা করেনি। সরকার দাবিসনদ বিবেচনার জন্য সময় চেয়েছে। কিন্তু কত সময় নেবে। কিন্তু এতে কোন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেই কেন্দ্রের। ফলে বাধ্য হয়েই আমাদের ধর্মঘটে বহাল থাকতে হচ্ছে।

নয়া উদারবাদের জমানায় শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার স্বার্থে এ যাবৎ ১৪ বার ধর্মঘট হয়েছে। কিন্তু কোন কিছু বদলায়নি। অন্যদিকে শ্রমিকদের অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। তাদের মজুরি কমেছে। চাকরির কোন নিরাপত্তা নেই। চলছে নির্বিচারে ছাঁটাই। অন্যদিকে শাসকশ্রেণীর চলেছে বল্গাহীন দুর্নীতি। চরম দুর্নীতিতে নয়ছয় হচ্ছে জাতীয় সম্পদ। এতে প্রতিবাদী ধর্মঘটের বিরোধিতা করে শাসক দলের চলছে হুমকি, নির্যাতন। সাংসদ গুরুদাস দাশগুপ্ত বলেন, পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকার যেভাবে ধর্মঘটের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছেন তা দেশের আর কোথায় দেখা যায় না। রাজ্যে মন্ত্রীরা এতে পশ্চিমবঙ্গের সর্বনাশের কথা বলছেন। শ্রমিক সংগঠকদের বক্তব্য সারা দেশের মানুষের সঙ্গে রাজ্যে শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরি মেলে না। খাদ্যপণ্যের বাজার ছাড়া দাম। এসবের প্রতিকারে কেন্দ্রকে উদ্যোগ নেওয়ার দাবিতে এই ধর্মঘট। একে যারা বিরোধিতা করছে তারা আসলে মুনাফাখোরদের শ্রেণী স্বার্থ দেখছে। শ্রমিক আন্দোলন দমনে এসব দালাল শ্রেণীর সক্রিয়তা বারে বারে দেখা গেছে। এবারেও তার কোন ব্যতিক্রম নেই।

এদিন শেষ দফার বৈঠকে মিলিত হয়েছেন সমস্ত কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠন। বি এম এস-র দপ্তরে ঐ বৈঠকে ছিলেন সি আই টি ইউ-র পক্ষে তপন সেন, স্বদেশ দেবরায়, এইচ এম এস-র হরভজন সিং সিধু, এইচ এম এস-র আর এ মিত্তাল, বি এম এস-র বি এল রায়, এ আই টি ইউ সি-র গুরুদাস দাশগুপ্ত,আই এন টি ইউ সি-র অশোক সিং, পি এন রাজু, এ আই সি সি টি ইউ রাজু, ইউ টি ইউ সি-র অবনী রায় প্রমুখ। বৈঠকে সকলেই কেন্দ্রের শ্রমিক স্বার্থ-বিরোধী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁদের মত সরকারের সঙ্গে বৈঠক কার্যত নিষ্ফলা হয়েছে। দেশের কোন রাজ্যেই আজ শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত নয়। অথচ মুনাফা বেড়েই চলেছে কর্পোরেটদের। গুরগাঁওয়ের মারুতি কারখানার মুনাফা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন নেতৃত্ব। সে রাজ্যে শ্রমিক স্বার্থ-বিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা সাংবাদিকদের জানান সংগঠকেরা।

এদিকে ধর্মঘটের ফলে আর্থিক ক্ষতির কথা যেমন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ঠিক একই সুর শোনা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রীদের মুখে বলে জানান শ্রমিক সংগঠকরা। শ্রমিক সংগঠকেরা পালটা তথ্য তুলে বলেন যে মন্ত্রীরা রাজ্যের ক্ষতির কথা বলছে তারা আসলে কর্পোরেটদের বেপরোয়া মুনাফার সঙ্গে মজুরি কমার বিষয়কে আড়াল করছে। আড়াল করছে কেন্দ্রের কর্পোরেটদের মুনাফা বাড়াতে কর ছাড়ের নামে ভরতুকি দেওয়া অন্যদিকে পেট্রোপণ্য, খাদ্য, সারে এতে ভরতুকি কমিয়ে বাজারে দাম চড়া হারে বাড়ানোর ব্যবস্থা করা। তারা জানান আজ দেশে মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাত্র ১.৭৮ শতাংশ অর্থ খাদ্য, সার, পেট্রোপণ্যসহ সমস্ত সামাজিক প্রকল্পের ভরতুকিতে ব্যয় হয়। প্রতিবছর তা কমেছে। এবারে তা আরো কমানো হবে। যার প্রতিফলন পড়ছে, বাজারে সমস্ত কিছু দাম বাড়ায়। অন্যদিকে কর্পোরেটদের কর ছাড় দেওয়ার হার প্রতিবছর বাড়ছে। এবারে ঐ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৪ শতাংশ। প্রায় চার গুণ, সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয় হওয়ার ভরতুকিতে। জনসংখ্যার মাত্র এক শতাংশ কর্পোরেটদের জন্য ৪ শতাংশ ভরতুকি অথচ ৯৯ শতাংশ জনতার জন্য এক শতাংশ ভরতুকি। এই তথ্য আড়াল করতে নেমেছে কর্পোরেট মিডিয়া থেকে শুরু করে শাসক দলের নেতা মন্ত্রীরা।

এদিকে ধর্মঘটের প্রস্তুতিতে যে ঐক্যবদ্ধ চেহারা আজ দেখা যাচ্ছে তা অভূতপূর্ব বলে জানালেন সি আই টি ইউ নেতা তপন সেন। তাঁর মত বিশ্বজুড়ে আজ শ্রমিকশ্রেণীর জীবন-জীবিকা আক্রান্ত। আমাদের দেশে সঙ্কট আরো চরমে। প্রতিদিন ছোট ছোট বহু শ্রমিক সংগঠন এই ধর্মঘটে শামিল হচ্ছেন। তিনি বলেন, জীবিকা রক্ষায় ধর্মঘট ছাড়া আর কোন পথ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক-ধর্মঘট ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি এ প্রসঙ্গে গ্রিসে মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টার ধর্মঘটের কথা উল্লেখ করেন। প্রসঙ্গত ঐ ধর্মঘটে কল কারখানা অফিস আদালত শুধু নয় মিডিয়াও শামিল হয়েছে ধর্মঘটে। মিডিয়ায় চলেছে লাগাতার ছাঁটাই ও বেতন সংকোচন। ২০১০ থেকে তা শুরু হয়েছে, ইতোমধ্যে ৩০ শতাংশ সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। বেতন কমানো হয়েছে ৩০ শতাংশ হারে। তা আরো কমানোর কথা ঘোষণা হয়েছে। মিডিয়া সংগঠন স্থির করেছে চ্যানেল, রেডিও, সংবাদপত্র পুরো বন্ধ থাকবে সারা দেশে। কর্মীরা পালন করছে ধর্মঘট কোন সংবাদ পরিবেশন হবে না। হবে না কোন ওয়েবসাইটে সংবাদ বিতরণ। এমনকি ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতির ঐ দেশ সফরের কর্মসূচী থাকলেও তাতেও অংশ নিচ্ছে না মিডিয়া। দেশের ১১টি চ্যানেল, ৭১টি রেডিও স্টেশন, ২২টি জাতীয় দৈনিক ও অসংখ্য সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক পত্রিকা কর্মীরা পালন করছে ধর্মঘট।

শ্রমিক সংগঠকদের মত, কর্পোরেটদের মুনাফা কমানোর দাপটে নিশ্চিত নয় মিডিয়ায় কর্মীর জীবিকাও। ভারতে শ্রমজীবীদের জীবন-জীবিকা রক্ষার আন্দোলনেও এ প্রশ্ন এবারে উঠে আসছে।


No comments:

Post a Comment