(CLICK ON CAPTION/LINK/POSTING BELOW TO ENLARGE & READ)

Sunday, February 17, 2013

রক্তচোখ উড়িয়ে দিয়ে জনস্রোতে ভাসলো চুঁচুড়া l শেষ মুহূর্তে অনুমতি বাতিল করে সভা পণ্ডের চেষ্টা l


রক্তচোখ উড়িয়ে দিয়ে  জনস্রোতে ভাসলো চুঁচুড়া l শেষ মুহূর্তে অনুমতি বাতিল করে সভা পণ্ডের চেষ্টা l

প্রসূন ভট্টাচার্য

চুঁচুড়া, ১৭ই ফেব্রুয়ারি— শেষ মুহূর্তে প্রশাসনিক নির্দেশ পাঠিয়ে চুঁচুড়া ময়দানে হুগলী জেলা বামফ্রন্টের সভা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চালালো রাজ্য সরকার। রবিবার দুপুরে সভা শুরুর ঘণ্টাখানেক আগে সভা মঞ্চে নোটিস আটকে সদর মহকুমার প্রশাসন জানিয়ে দিলো সভায় মাইক্রোফোন ব্যবহারের অনুমতি প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব করেও সভা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি তারা। ঝিরঝির বৃষ্টি আর ঠাণ্ডা হাওয়ার মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে একটি ম্যাটাডোরের ওপরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ।

বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র এই সভাতেই দাঁড়িয়ে জানিয়ে দিলেন, এভাবে ঠেকানো যাবে না, সরকার মানুষের কণ্ঠরোধের যত চেষ্টা করবে, প্রতিবাদ ততই জোরালো হবে। এই মাঠেই আরো বড় জনসভা করে কণ্ঠরোধের অপচেষ্টার জবাব দেওয়া হবে। সেই জনসভায় আজকে যাঁরা এসেছেন তাঁরা আসবেন, যাঁরা আসেননি তাঁরাও আসবেন। কারণ সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক কাজকর্মে মানুষ ক্রমশই বেশি করে বুঝতে পারছেন যে, দাঁড়িয়ে থাকার মতো আর কোনো জায়গা নেই, প্রতিবাদের জায়গাতেই আসতে হবে। মিশ্র রাজ্য সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মাঠ রাস্তা শহর ভরে যাবে মানুষের ভিড়ে, লাল পতাকায় ভরে যাবে চারিদিক, মুখ্যমন্ত্রীর নীল সাদা রঙ মুছে যাবে। তখন মুখ্যমন্ত্রী সরকার ছেড়ে পালানোর কথা বললেও রেহাই পাবেন না। সব মানুষ যতদিন না এই সরকারকে পুরোপুরি চিনে নিয়ে প্রতিবাদে নামছেন, ততদিন আমাদের কোনো বিশ্রাম নেই, উই উইল নট রেস্ট।

মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা, নারী নির্যাতন, রাজ্যে সন্ত্রাস ইত্যাদি বিষয়ে হুগলী জেলা বামফ্রন্ট এদিন চুঁচুড়া ময়দানে সমাবেশের ডাক দিয়েছিল। শীতের আবহাওয়ার মধ্যেই ক্রমাগত ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে এদিন রাস্তায় বের হওয়ার মতো পরিবেশ ছিল না। তা সত্ত্বেও বাস লরি ট্রেনে হাজারে হাজারে মানুষ জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এদিন চুঁচুড়ার সমাবেশে আসেন। কিন্তু এরপরেও প্রশাসনের সাহায্যে তৃণমূল কংগ্রেস যেভাবে সভাটি পণ্ড করে দিতে নামে তা নজিরবিহীন। ডিসেম্বর মাসে সভা করার জন্য জেলা বামফ্রন্ট চিঠি দিয়েছিল প্রশাসনকে। গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক অনুমতিও এসে যায়। কিন্তু এদিন মিটিং শুরুর ঘণ্টাখানেক আগে সি পি আই (এম)-র জেলা সম্পাদক সুদর্শন রায়চৌধুরীর কাছে পুলিস মারফত একটি নোটিস পাঠিয়ে সভায় মাইক ব্যবহারের অনুমতি প্রত্যাহার করে নেওয়ার চেষ্টা করে প্রশাসন। ততক্ষণে মাঠে মানুষ চলে আসতে শুরু করেছে, রাস্তায় আসছেন আরো বহু মানুষ। মাঠ ও রাস্তার ধারে মাইক লাগিয়ে পতাকা লাগিয়ে সবকিছু প্রস্তুত। সভা শুরুর সামান্য আগে এই ধরনের নোটিস গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন সুদর্শন রায়চৌধুরী। দুপুর একটার সময় সমাবেশের মঞ্চের গায়ে সাবডিভিসনাল ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষরিত নোটিসটি লটকে দিয়ে চলে যান সরকারী অফিসাররা।

জানা গেছে, মাদ্রাসা পরীক্ষার জন্য এই প্রকাশ্য সভা বন্ধ করতে একটি আইনী চিঠি দিয়েছিলেন তৃণমূলের এক আইনজীবী। সেই পরিপ্রেক্ষিতে মহকুমা প্রশাসন তাদের আগের অনুমতি প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যে সভায় যোগ দিতে মানুষ আসেন সেই সভার অনুমতি সভা শুরুর একঘণ্টা আগে প্রত্যাহার কেন? কেন জেলা বামফ্রন্টকে আগে থেকে এই বিষয়ে অবহিত করা হলো না? 

সুদর্শন রায়চৌধুরী বলেন, আমরা নিয়ম মেনে, প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে সভার আয়োজন করি। শেষ মুহূর্তে সেই অনুমতি বাতিল কোন্‌ রাজনৈতিক চাপে? পরীক্ষার সূচী তো অনেক আগেই নির্ধারিত, প্রশাসনের তো তা অজানা থাকার কথা নয়। তারজন্য অনুমতি বাতিল করতে হলে আগে কেন সেই অনুমতি দেওয়া হলো? এর আগেও পুলিস প্রশাসনকে দিয়ে আরামবাগের রবীন্দ্রভবনে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সভা বাতিল করার চেষ্টা করেছিল তৃণমূল সরকার। এবারও নির্লজ্জভাবে সেই কাজই করলো। রায়চৌধুরী প্রশাসনকে পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, বামফ্রন্টের সভায় আপত্তি থাকলে আজই রবীন্দ্রভবনের সামনে প্রকাশ্যে মাইক বাজিয়ে তৃণমূলের প্রচার চলছে কী করে? প্রশাসনের কানে সেই আওয়াজ যাচ্ছে না? 

মঞ্চের গায়ে যে নোটিসটি লটকে দেওয়া হয়েছিল সেটি ‘জেলা বামফ্রন্টের সম্পাদক অমিত পালের’ উদ্দেশ্যে পাঠানো। সুদর্শন রায়চৌধুরী বলেন, জেলা বামফ্রন্টে সম্পাদক বলে কোনো পদও নেই, অমিত পাল বলে কোনো পদাধিকারীও নেই। আমরা ঐ নোটিসকে গ্রাহ্য করছি না। কিন্তু সৌজন্যবশত মঞ্চ ব্যবহার করে সভা করছি না, মাইকও ব্যবহার করছি না।

দুপুর দুটোর সময় বৃষ্টির মধ্যেই মাঠে ছাতা হাতে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তখন মঞ্চের পাশে একটি ম্যাটাডোর এনে তার দুপাশে সাউন্ড লিমিটার লাগানো দুটি বক্স ব্যবহার করে সভার কাজ শুরু করা হয়। সভায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ভাষণ দেবেন বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি আসেননি, পরিবর্তে বিরোধী দলনেতা সভাস্থলে আসেন। ম্যাটাডোরের ওপরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন তিনি, বৃষ্টির জলে চশমার কাচ অস্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে বলে চশমা খুলে রাখেন। সমবেতরা তাঁর নামে ‘লাল সেলাম’ স্লোগান দিচ্ছেন শুনে বলেন, এই আবহাওয়ার মধ্যেও আপনারা এসেছেন, আমরাই বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে আপনাদের লাল সেলাম জানাচ্ছি। 

আরামবাগে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সভার সময় থেকেই হুগলী জেলার তৃণমূল নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন বামপন্থীদের জনসমাবেশের সুযোগ দিলেই মুশকিল। প্রতিবাদী কণ্ঠ দানা বাঁধবে। তাই এদিনও সমাবেশ বানচাল করতে তারা পরিকল্পিতভাবে সচেষ্ট ছিল। সমাবেশে যোগ দিতে আরামবাগ, খানাকুল, গোঘাট থেকে যেসব মানুষ আগের রাতে এসেছিলেন তাঁদের চুঁচুড়ার বিভিন্ন জায়গায় থাকতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এদিনও দিল্লি রোড দিয়ে সমাবেশে যোগ দিতে আসা বেশকিছু বাস লরিকে থামিয়ে পুলিস তাদের ফেরত পাঠিয়ে দেয়। বলে, সভা বাতিল হয়ে গেছে। 

সূর্যকান্ত মিশ্র তাঁর ভাষণে বলেন, এই সরকারের হাতে শুধু বামপন্থীরা নয়, সবাই আক্রান্ত। মুখ্যমন্ত্রী নাচগান উৎসব নিয়ে আছেন। বলছেন, উৎসব নয়তো কি শ্রাদ্ধ করবেন? আসলে মুখ্যমন্ত্রী টাকার শ্রাদ্ধ করছেন। এই টাকা তৃণমূলের কোনো নেতা মন্ত্রীর পৈতৃক সম্পত্তি নয়, জনগণের টাকা। তিনি বলেন, পঞ্চায়েত নির্বাচনে বামপন্থীরা মনোনয়ন জমা দিতে পারবে কিনা মুখ্যমন্ত্রী তা বামপন্থীদের ওপরেই ছেড়ে দিন। কিন্তু যা চলছে তাতে তৃণমূলের এক গোষ্ঠীকে আরেক গোষ্ঠীর হাত থেকে কীভাবে রক্ষা করবেন সেটা মুখ্যমন্ত্রী ভেবে দেখুন। 

জেলায় জেলায় তোলাবাজি থেকে শুরু করে শিল্প ধ্বংস করা, পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদ, তৃণমূলের হাতে পশ্চিমবঙ্গ যেভাবে চলছে তাতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মিশ্র বলেন, ভবিষ্যতে সরকারে যারাই আসুক এই ক্ষতি সামলানো কঠিন হয়ে যাবে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কেবলই ভাঙার রাজনীতি করছেন। এই রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে বামপন্থীদের গড়ার কাজ করতে হবে। পঞ্চায়েত, সমবায়, স্বনির্ভর গোষ্ঠী, সাক্ষরতা আন্দোলন, রক্তদানের আন্দোলন সবকিছুতে রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বামপন্থীদের কাজ করতে হবে। সমাবেশে এছাড়াও ভাষণ দেন আর এস পি নেতা মনোজ ভট্টাচার্য, সি পি আই নেতা আশিস ভৌমিক, ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা নরেন দে ও মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা চণ্ডী গাঙ্গুলি। আগামী ২০-২১শে ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট সফল করার আহ্বানও জানিয়েছেন তাঁরা।

No comments:

Post a Comment