(CLICK ON CAPTION/LINK/POSTING BELOW TO ENLARGE & READ)

Thursday, April 11, 2013

REIGN OF TERROR BY MAMATA IN SCHOOLS, COLLEGES, UNIVERSITIES


শিক্ষাঙ্গনকে দূষণমুক্ত করার লড়াই চলবে|

উৎপল রায়

ছাত্র আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক, ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের রাজ্য কমিটির সদস্য সুদীপ্ত গুপ্তকে পুলিসী হেফাজতে খুন হতে হ‍‌লো। তৃণমূল কংগ্রেস দলের নামে নির্বাচিত হলেও একক মমতা ব্যানার্জি পরিচালিত সরকারের পুলিসের উপরে এরকমই নির্দেশ ছিল। এইরকম নির্দেশই থাকছে। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে আগুয়ান সুদীপ্তর কী অপরাধ ছিল? সুদীপ্ত অন্যান্য ছাত্রদের সাথে আইনের অমান্যতাকে রুখতে গিয়েছিল। গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত একটি রাজ্য সরকার গণতন্ত্রকে ভয় পাচ্ছে, তাই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনকে ভয় পাচ্ছে। গণতন্ত্রকে না মানার, যে কোন নির্বাচনকে বন্ধ করে দেওয়ার আইন কায়েম করতে চাইছে রাজ্যে। যেটি ‘অব্যবস্থা’ বা ‘বেআইনী’ তাকেই ‘ব্যবস্থা’ বা ‘আইন’ বলে জনগণের ঘা‍‌ড়ে চাপিয়ে দিতে চাইছে। রাজ্য সরকারের প্রশাসনের প্রতিটি অঙ্গ-উপাঙ্গ এই কাজে নিষ্ঠার সাথে তৎপরতা দেখাচ্ছে। গণতন্ত্রকে না মানার বিরোধিতা করছে ছাত্ররা। মমতা ব্যানার্জির আরোপিত ‘আইন’কে না মানা যদি আইন অমান্য হয় তো তাই। সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে কমরেড সুদীপ্ত গুপ্তকে রাজ্য সরকারের পুলিস মেরে ফেলল! দলমত নির্বিশেষে শুধু এই রাজ্য নয় সারা ভারতের মানুষ বেদনায় হতবাক। সম্বিত ফিরে পেয়ে ক্ষোভ, ঘৃণা প্রকাশ করছে মানুষ ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়, সংগঠিতভাবে রাস্তায় নেমে। একমাত্র দল তৃণমূল কংগ্রেস দূরে থেকে উপভোগ করছে শিক্ষক জিতেন নন্দী থেকে ছাত্র সুদীপ্ত গুপ্তর হত্যালীলা। এখানে ওখানে পথ চলতি শোনা যাচ্ছে ‘ওটা কী আর দল, মানুষ মারার কল’। মুখ্যমন্ত্রী সুদীপ্ত গুপ্ত’র হত্যার ঘটনাকে মিডিয়ায় কম ‘স্পেস’ দিতে তৎপর হলেন নিজে নাচা গানায় মত্ত থেকে। কিন্তু সে কী আর সবটা হয়? হয়নি।

বেঙ্গালুরুতে গিয়ে মমতা ব্যানার্জির ঘটনাকে আড়াল করার আবারও মরিয়া চেষ্টা। সুদীপ্ত’র পুলিস হেফাজতে মৃত্যু মোটেই হত্যা নয় দুর্ঘটনা। নেহাতই ‘তুচ্ছ’ ঘটনা। মমতা ব্যানার্জির ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ সব গেলেন কোথায়? কেউ কেউ তো পুরস্কারে ঢাকা পড়ে, চাপা পড়ে যাচ্ছেন। কেউ বোঝাচ্ছেন না ‘ছোট্ট ঘটনা’ ‘তুচ্ছ ঘটনা’ এ সব বলতে নেই! ইতিহাস বড় নির্মম। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় যে আধা ফ্যাসিস্ত রাজ কায়েম করেছিলেন তাতে সাধারণ মানুষ তাঁকে ‘ফ্যাসিস্ত’ মুখ্যমন্ত্রী বলেই জানে। তাঁর আগে প্রফুল্লচন্দ্র সেন ভাত অমিল করে রাজ্যবাসীকে কাঁচকলার পুষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান বিতরণ করেছিলেন। খাদ্য আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ১৯৬৭’র প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে মানুষ তার জবাব দিয়েছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্র সেন ‘কাঁচকলা মন্ত্রী’ আখ্যা পেয়েছিলেন। এখনকার মুখ্যমন্ত্রী কী শিরোপা পাবেন ‘ছোট্ট’ না ‘তুচ্ছ’ তা মানুষের পছন্দের ব্যাপার। প্রসঙ্গান্তরে যাব না।

ছাত্রদের সঙ্গত দাবি শিক্ষাক্ষেত্রে গণতন্ত্র চাই। রাজ্যের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদেরও একই দাবি। সারা রাজ্যেই এখন গণতন্ত্র বিপন্ন। মানুষের দাবি সর্বক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে হবে। মমতা ব্যানার্জিদের বক্তব্য শিক্ষাক্ষেত্রে গণতন্ত্র ফেরাব না। ‘শিক্ষাকে রাজনীতি মুক্ত করব’। মুখ্যমন্ত্রীর শেখানো বুলিই কপচে যাচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী। ক্ষমতাকে অজ্ঞতা নিয়ন্ত্রণ করলে এমনই নির্মম, ভয়ঙ্কর হয়। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘুরপথে হচ্ছে। শিক্ষাকে রাজনীতিমুক্ত করা যায় না, যাবে না।

পৌরাণিক কাহিনী কাহিনীই। কিন্তু কাহিনী বর্ণিত সমাজচিত্র ফেলনা নয়। কিছুটা তো ইতিহাসের উপাদান। সেই সমাজে শিক্ষালাভে আগ্রহী একলব্যদের আধিপত্যবাদের রাজনীতির শিকার হওয়া ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। যখন ধর্ম-বর্ণের সীমারেখা টানা গুরুগৃহের প্রাঙ্গণে শিক্ষা সঙ্কুচিত ছিল, রাজন্যবর্গের সমর্থনে যা স্বাভাবিক ছিল তখন তো কৃত্তিবাসকে মহাকবি হয়ে উঠবার উপযুক্ত পরিসর পেতে ‘এগারো নিবিড় যখন বারোতে প্রবেশ’ বয়সে দূর উত্তরবঙ্গের গুরুগৃহে যেতেই হতো। শিক্ষাকে চিরকাল রাজনৈতিক শক্তি আধিপত্য কায়েম রাখতে নিয়ন্ত্রণ করেছে, করছে। রাজা রামমোহন রায়ের সংগ্রাম ছিল সমাজের ‘অন্ধত্ব’ নিবারণের তাগিদে। সেই উদ্দেশ্যেই সামন্ততন্ত্রের জোয়াল থেকে শিক্ষাকে মুক্ত করাই ছিল তাঁর লড়াই এবং এতেই এদে‍‌শে শিক্ষা আন্দোলনের উন্মেষ সূচিত হয়। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ রাজপুরুষদের সাথে বিবাদ করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষাকে জনমুখি করার প্রয়াস, পাঠক্রমে বিজ্ঞান শিক্ষা যুক্ত করা, নারী শিক্ষার জন্য ক্লান্তিহীন প্রয়াস তো শিক্ষা সম্পর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিপ্রতীপে প্রতিস্পর্ধী অবস্থানের প্রথম আলোক স্তম্ভ। এ সবই শিক্ষার জন্য রাজনৈতিক চর্চা। ‘শিক্ষাকে রাজনীতিমুক্ত করা হবে বলে’ মহাশক্তিধর মাননীয় মমতা-ব্রাত্য’র নিনাদ আর্তনাদের মতোই শোনাচ্ছে। ‘শিক্ষা’ একটি রাজনৈতিক বিষয়। মানুষের ক্ষমতায়নের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। রাজনৈতিক শক্তিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে শিক্ষাকে সঙ্কুচিত কুক্ষিগত রাখা হবে না জনগণের জন্য সম্প্রসারিত করা হবে। জনগণের ক্ষমতায়নের সুযোগ দেওয়া হবে না আধিপত্যকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থে শিক্ষাকে ব্যবহার করা হবে।

বঞ্চনাকারীর সাথে বঞ্চিতের সংঘবদ্ধ লড়াইয়ের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই মানুষ ‘শিক্ষা’ সম্পর্কে নাক গলায়, মাথা ঘামায়। অতএব শিক্ষার রাজনীতি, শিক্ষায় রাজনীতি চলবে। বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা যা দেখে রবীন্দ্রনাথের মুগ্ধতা তো নিছক ব্যক্তির অনুভূতি নয়, তা আমাদের শিক্ষা আন্দোলনের প্রেরণাও বটে। কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লবী সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তক্রমেই সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের প্রতিটি নাগরিককে শিক্ষার অঙ্গনে টেনে আনায় পূর্ণ সাফল্য অর্জিত হয়েছিল। শিক্ষা সম্প্রসারণের সেই লক্ষ্যকে সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যে ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট সরকার রূপায়ণ করে গিয়েছে। সেও তো শিক্ষার রাজনীতি। আবার আজ যখন এক এক ফুঁয়ে শিক্ষাঙ্গনের গণতন্ত্রের দীপশিখা নিভিয়ে দিতে তৎপর রাজ্য সরকার, যে সরকারের কান নেই, চোখ নেই, মস্তিষ্কও নেই শুধুই দাঁত আর নখের জান্তব উদ্ভাস তখন সুদীপ্তরা ছাড়বে কেন? ডিরোজিও - সূর্য সেন - আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ছেড়ে না দিতেই তো ব‍‌লে গিয়েছেন।

টেট পরীক্ষার কেলেঙ্কারিকে কার্যত সমর্থন করে মুখ্যমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীকে অভিনন্দন জানালেন। সাংবাদিক সম্মেলনে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের সভাপতি মানিক ভট্টাচার্য জোরদার ভাষণ দিলেন। তবু‍‌ও কোন বাহবা জুটলো না— মনে হয় অনুপস্থিত বৈধ পরীক্ষার্থীরা দ্বিতীয়বার সুযোগ পাবেন বলেই ফেঁসেছেন। কারণ তার আগে ‘অবৈধ’ পরীক্ষার্থীরা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সরকারী আনুকুল্যেই সুযোগ পেল! পোড় খাওয়া মানিকবাবু নেত্রীর চিন্তাকে অনুসরণ করতে পারছেন না, আশ্চর্য! জানা গিয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফর্ম পূরণ না করেও যারা পরীক্ষায় বসেছে তাদের টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বলে বিদ্যালয় প্রধানের শংসাপত্র ২৫শে মার্চের মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদে জমা দিতে হয়েছে। দ্রুত শংসাপত্র জমা পড়ার জন্য রাজ্যব্যাপী ছড়িয়ে থাকা ‘গোস্টাপো বাহিনী’কে নিশ্চয়ই বলে রাখা হয়েছিল বিদ্যালয় প্রধানদের নজরে রাখতে।

সুদীপ্তর মস্তিষ্কের প্রতি কোষে দিন বদলের স্বপ্ন গোঁজা ছিল। সুদীপ্তকে মাথায় আঘাত করা হয়েছে। যে সব ছাত্রছাত্রী বেঁচে থাকবে তাদের মস্তিষ্ককে শূন্যগর্ভ, দিশাহীন করে তোলার আয়োজন করছে মমতা ব্যানার্জিরা! এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে রাজনীতিকে মহোত্তম উপাদানে সমৃদ্ধ করার সুযোগ ছাড়বে না ক্ষুদিরাম - সুভাষচন্দ্র - নুরুল ইসলাম - স্বপন কোলে - সুদীপ্ত গুপ্তর উত্তরসূরি সাথীরা। ছাত্রদের, তারুণ্যের আগুয়ান সাহসিকতার মুগ্ধ সাথী আছে গোপাল সেন - বিমল দাশগুপ্ত - সন্তোষ ভট্টাচার্য - সত্যপ্রিয় রায় - অনিলা দেবী - আল্লারাখা - দিবাকর মাহাতো - জিতেন নন্দীর উত্তরসূরিরা, সাথী শিক্ষক সমাজ।

সুদীপ্ত নেই, সুদীপ্ত আছে, সুদীপ্তরা আছে ক্লাসরুমে - রাস্তায়। এদেশে বিদেশীদের শিক্ষার দোকান খোলার বিরুদ্ধে, শিক্ষার বেসরকারীকরণ - গণতন্ত্র হরণের বিরুদ্ধে সেদিনের ছাত্র আজকের ছাত্র সবাই আজ রাস্তায়। অবিরাম তাজা খুনে সরস্বতীর শ্বেত কমল লাল হয়ে উঠছে। শ্রেণীকক্ষ থেকে রাজপথে প্রসারিত শিক্ষার অঙ্গন আবারও। প্রসারিত শিক্ষাঙ্গন দূষণমুক্ত করার স্বার্থে রাজনীতি চলছে চলবে। আধিপত্যবাদের দানবের সাথে লড়াই জারি আছে। পথে নেমে পথেই সাথী হয়ে উঠছে সবাই। পথেই হবে পথ চেনা।

No comments:

Post a Comment