(CLICK ON CAPTION/LINK/POSTING BELOW TO ENLARGE & READ)

Thursday, April 11, 2013

SFI LEADER SUDIPTA GUPTA MURDERED BY MAMATA'S POLICE


রামেশ্বরের চিহ্ন

শেখ শুভদয়

এক   

রোদ মাথায় ছেলেটা বেরিয়েছিলমিছিলের ডাকে বাড়ি থেকে বের হলে যেমন হয়, বুকের মধ্যে বৈঠা বায় প্রিয়তম কবিতার মৃত্যুহীন পঙ্‌ক্তিগুলি, মনে হয় হালকা হাওয়ায় পার হয়ে যাচ্ছি পথগলায় এসে হঠাৎ পাপড়ি মেলে সাথীদের সঙ্গে গাওয়া গান, এবার তো উড়ে পার হয়ে যাওয়া পথ

রোদ! কোথায় রোদ, এই বয়স, এমন সময় অমন মাঝ চৈত্রের রোদও গায় শানায় নাকি! ছেলেটা নিশ্চয়ই ‍‌নিজের সঙ্গে কথা বলছিলএকুশ-বাইশ বছরের ছেলে মিছিলে বের হবার আগে যেমন নিজের সঙ্গে কথা কয়একটু পরেই বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণ খুলে কত কথা, পাঁজরের খোলের মধ্যে টানটান পর্দায় ঘা মেরে ড্রাম বিটিং-এর মতো স্লোগান, দামামার মতো স্লোগান!

ছেলেটা মিছিলের ডাকে বাড়ি থেকে রোদ মাথায় বের হবার সময় কী উল্লাসে নিজের সঙ্গে কথা কইছিল

দুই

তারপর, ২রা এপ্রিল আমরা সারা রাত বিনিদ্র অথবা আধো ঘুমে কথা কয়েছি ছেলেটার সঙ্গেসাঁঝবেলায় হাসপাতালের ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ঘরে শুয়ে ছেলেটা নিজের সঙ্গে সব কথা শেষ করেছেআর আমরা সারা রাত অনন্ত কথা কয়েছি, কয়ে যাচ্ছি ছেলেটার মুখোমুখি

আমরা যারা, সময় খানিকটা বেজুত, সময়ের খানিকটা বিসুখ বলে, একটু গা ঢাকা দিয়ে আছি, একটু সামলে-সুমলে চলছি, একটু আপস, হয়তো প্রয়োজনমতো তোষামোদের চাদর-টাদরেও গা মুড়ে নিচ্ছি মাঝে মধ্যে আমরা ছেলেটার সঙ্গে সারা রাত সারা দিন কথা কয়ে যাচ্ছি! তুই পারলি, আমরা পারব না! পারব, দেখে নিস!

ছেলেটার সঙ্গে সারা রাত কথা কয়েছে মায়েরা আমার ছেলেটাও তো তোর মতো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে! চে-র মুখ আঁকা গেঞ্জি পরে, সুকান্ত-বিষ্ণু দে আওড়ায়, আপন মনে আওড়ায় জয়দেব-মল্লিকা, গিটারে গুনগুন ক‍‌রে সলিল-সুমনও তোর সঙ্গে তো মিছিলে যাবে বলেছিল! তুই যদি আমার ছেলে হতিস, তুই যদি...! শেষ কোথায়, এসবের শেষ কোথায়!

আমরা ছেলেটার সঙ্গে সারা রাত কথা কয়েছিআমরা যারা সময় সুখ-অসুখের ওঠা পড়া পরোয়া করি না! পরোয়া করি না শতাংশের হিসেব নিকেশ! শতাংশ কোন্‌ ছারবদলাতে হবে তো দিন! শাবাশ কমরেড, বুকের পাটা আছে বটে তোর! গাইতে পারিস, লিখতে পারিস লড়তেও পারিস! চলে যাচ্ছো! এতো তাড়াতাড়ি! আবার দেখা হবে ব্যারিকেডের পারে!

২রা এপ্রিল সাঁঝবেলায় ছেলেটা শেষ করেছে নিজের সঙ্গে সব কথা গান কবিতাএখন তার সঙ্গে আমাদের কথা গান কবিতা ও গদ্যের অনন্ত

সুদীপ্ত আসলে সেই নবীন কথাবৃক্ষনিরঞ্জন বোধিবৃক্ষমৃত্যুঞ্জয় কথাবৃক্ষ! যার সঙ্গে কথাবার্তা সেরে, যাকে ছুঁয়ে আজ থেকে আমাদের সকল স্কোয়াডে মিছিলে পথ চলা!

তিন

একটি মৃত্যুহীন মৃত্যুর সঙ্গে অনন্তজনের অনন্ত কথা বলার এই ধরনটা অসামান্য আবিষ্কার করেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়১৯৪৬-এর ১১ ও ১২ই ফেব্রুয়ারি, রশিদ আলি দিবসকলকাতার পথে ছাত্রদের দামাল মিছিলমিলিটারি গাড়ি সঙ্গে ছাত্র-জনতার মোকাবিলা১২ শহীদের রক্তে পবিত্র ১২ই ফেব্রুয়ারিমানিকবাবু লিখেছিলেন উপন্যাস চিহ্নতিনি নিজেই কবুলিয়ত দিয়েছিলেন, বইখানা নতুন টেকনিকেলেখাএক-একটি মৃত্যুহীন মৃত্যুর সঙ্গে দেশজোড়া মানুষের হৃদপিণ্ড মোচড়ানো কথা!

একটি মৃত্যুকে সামনে রেখে সীতা বলে ওঠে রাজনীতি-বিমুখ ছাত্র হেমন্তকে, সব কিছু থেকে ওভাবে গা বাঁচিয়ে কারা লেখাপড়া শেখে জানো ভালোছেলে ? দেশের প্রয়োজন, দেশের কথা যারা ভাবে তারা নয়, পাস করে পেশা নিয়ে নিজে অরামে থাকার কথা যারা ভাবে তারাঅমন ভালোছেলেহেমন্তও যে মিছিলে গুলি চলেছিল সেই মিছিলে হাজির হয়, কারণ ততদিনে সে জেনে নিয়েছে, দেশের জন্যে লড়াইয়ে, রাজনীতিতে ছাত্রদেরও দায় আছে, সেই অংশগ্রহণ করা যে পড়াশোনার বিরুদ্ধে যায় নাবরং চরিত্র গঠনে আর মানসিক বিকাশেই সাহায্য করে!

রশিদ আলি দিবসের ছাত্র মিছিলের ডান হাতে গুলি লেগেছিল রসুলের এমন করে চিহ্নএঁকেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়১৯৪৬-এর সেই মাঝরাতে সে ফেরে তার আমিনা মায়ের কাছেএকটা হাত তো আছে, রসুল জোর দিয়ে বলে

আমিনা আত্মসংবরণ করেন আর্ত-চিৎকারে ফেটে পড়বার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে

আদর খেতে এলাম, আমায় মোটে আদর করছো না মা

তোর মা হওয়ার যা ঝকমারি, আদর করতে মোটে ইচ্ছে যায় না রসুল

রসুলের মাথাটা আরও জোরে বুকে চেপে ধরে আমিনা ....২রা এপ্রিল ২০১৩-র মাঝরাতে মানিকবাবুর চিহ্নপড়তে বসে মনে হলো, খড়গ্রামের যোশেফ হোসেনেরও তো ডান হাত ...পুলিসের মারে ডান হাত তো...? সে কি ফিরে গেল খড়গ্রামে তার জোহরা মায়ের কাছেচোখ কচলে মোবাইলের বোতামে আঙুল রাখিএকটু আগেও যে মেডিক্যাল কলেজের চত্বরে রাত-জাগা বন্ধু জানালো, যোশেফ ভালো নেই, যোশেফের জ্ঞান ফে‍‌রেনি, যোশেফের রক্ত বন্ধ হচ্ছে না, যোশেফের হাত...

২রা এপ্রিলের ২০১৩-র মাঝরাত ফেড়ে আমার হাঁফ পাড়তে ইচ্ছে করে, যো-শে-ফ! যোশেফ চোখ মেলে চা, যোশেফ উঠে বস্‌এই দেখ আমার হাততোর জন্যে কত অযুত হাত রাত জাগছে জানিস !

২রা এপ্রিলে রাত পার হয়ে ভোর হচ্ছেআমি তখন চিহ্নমুড়ে রেখে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী খুলেছি১৯৪৫-এর ২১শে নভেম্বর কলকাতার ছাত্র মিছিলে গুলি বর্ষালে শহীদ হয়েছিলেন রামেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়২১বছর এক মাস বয়সের এক কবি তাঁরই বয়সী ছাত্রশহীদের জন্যে লিখেছিলেন, ‘হে অশ্বারোহি! বাঁধ ভেঙে গেছে, শোনো প্লাবনের ডাক শোনো;/শিরায় শিরায় মহাপ্রলয়ের ডাক-শোনোসুদীপ্তর মরণকে আমরা বলেছিলাম জিয়নকাঠিবৃহস্পতিবার কোনো কাগজে দেখলাম খোঁচাজিয়নকাঠি খুঁজছে বামেরাওরা রামেশ্বর-এর মৃত্যুতে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সেই কবিতা পড়েনি বোধহয়হে অশ্বারোহি! হে মহাতরুণ! তোমার শপথ নিই লিখে।/মৃত্যুকে তুমি উপহাস করে করেছ জয়,/রক্তস্নানের মধ্যে হয়েছে অরুণোদয়,/...বামেরা শুধু কেন? বেসামাল সময়, আক্রান্ত সময়-সভ্যতা-শুভবোধই তো জিয়নকাঠি খুঁজছে সুদীপ্ত স্বপ্নময় দু-চোখ থেকে, ভোরের মতো নরম-নরম মুখপট থেকে চিরঞ্জীব মৃত্যু থেকে

গত রাতে টিভি পর্দায় দেখা ব্যান্ডেজ বাঁধা সুদীপ্ত-র মুখ আমি ফিরিয়ে আনছি, আর বিক্ষত সেই মুখে খুঁজছি, খুঁজে পেয়ে যাচ্ছি রামেশ্বরের চিহ্ন

চার

আরশির মতো দুই চোখ তারযেখানে চোখ সুদীপ্ত আসলে আমাদের পবিত্রতার প্রতীকপরশমণির মতো

রাজনীতিটা যে নেহাত পেটকাটা বাবলু, ইকবাল মুন্না, শম্ভুনাথ কাওদের সম্পত্তি নয়, হতে পারে না কখনো, তার সবুদ সুদীপ্তরাজনীতিকে ওদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না, রাজনীতি ওদের পোষা ডালকুত্তা হতে পারে না তার নিশান সুদীপ্তসেই গান গাওয়া, কবিতা-পড়া ছেলেটি, মিছিল সেরে এসে যে পড়তে বসে রুশোর সামাজিক চুক্তি, কিংবা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো, অথবা লেনিন অথবা অমর্ত্য সেন-উৎসা পট্টনায়েক কিংবা জয়তী ঘোষের ক্ষুধার গণরাজ্য ভাঙার অর্থশাস্ত্র

যে মজুর শিল্প ধর্মঘটের সমর্থনে বুক চিতিয়ে দেয়, যে কৃষক চূড়ান্ত হানাদারির মুখেও লালনিশান আঁকড়ে রাখে, রাখবে; যে যুবা হতাশার জন্যে জমি না ছেড়ে বর্শার মতো তীক্ষ্ণ রাখে শিরদাঁড়া, যে নারী সাক্ষরতা আন্দোলনের জন্যে সন্ধ্যেবেলায় আঙিনা পরিচ্ছন্ন রেখে আলো জ্বালায় তার অজর পবিত্রতার প্রতীক সুদীপ্ত

আরশির মতো দুই চোখ তারযেখানে চোখ রেখে আমি সহসা চিনে নিই আমাকে, আমার মতো অযুত আমিকে, আমার পার্টিকে

পাঁচ

৩রা এপ্রিল সকালে আমার ছেলে ভূগোল পড়ছিলঅথবা পদার্থবিদ্যাঅথবা পাঠ সংকলনে ‘‍গোরা’-র অংশ বিশেষকিছুতেই পড়াশোনায় মন থিতু করছিল না ছেলে আমারসামনে খোলা তিন-তিনখানা খবরের কাগজফরফর করে উড়ছেহাসছে সুদীপ্তসেদিকে তাকিয়ে আছে আমার ছেলেআমি সহসা তার ডান হাত ধরিসুদীপ্তর ছবির উপর চেপে ধরি তার হাতবলি, যোগ্য হও, যোগ্য হয়ে ওঠো!

ছয়

আসলে আমি তো তখন ২রা এপ্রিলের রাত পার হওয়া ভোরেই জেগে আছিএই বইমেলাতেই আমার ২২ বছর আগে এস এফ আই করা বান্ধবী হাতে দিয়েছিল চে-র একখানা আশ্চর্য নতুন ছবিআমি চে-র সেই মুখের দিকে তাকিয়ে সুদীপ্তর কথা ভাবছিসুদীপ্ত আমাদের ফেলে আসা একুশহাতের মণিবন্ধ চিরে খুঁজবো নাকি কোন্‌ শিরায় আমার গোল হয়ে জড়িয়ে আছে এস এফ আই!

সুদীপ্তর মুখের সঙ্গে কোথাও মিল আছে নাকি চে-রনা, নেইঅপাপবিদ্ধ হাসিটুকু ছাড়াচে দুনিয়াদুনিয়ার

সুদীপ্ত আমার বুকের মধ্যে আঁকা কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে কাকদ্বীপের বাংলাদেশ

No comments:

Post a Comment